অক্টোবর ১৯, ২০২১
মানচিত্র
বাংলাদেশ

মাটি কেটেছেন ‘মৃত’ ব্যক্তি, তুলেছেন ব্যাংকের টাকাও

বছর দেড়েক আগে মারা গেলেও প্রকল্পের মাটি কেটেছেন এক ব্যক্তি। কাজের বিনিময়ে পেয়েছেন ব্যাংকের চেক। সেই চেক দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকাও তুলেছেন। শুধু তাই নয়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে শ্রমিকের তালিকাতেও মৃত এ ব্যক্তির নাম রয়েছে।

বিস্ময়কর এ ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নে। এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন প্রোগ্রাম ফর দ্যা পুওরেস্ট (ইজিপিপি) কর্মসূচির আওতায় মাটি কাটেন ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের কাহেতপাড়া গ্রামের মৃত আছাদুজ্জামান।

আছাদুজ্জামানের পরিবার সচ্ছল হলেও দেখানো হয়েছে হতদরিদ্র। তার বাবার নাম মো. চান মিয়া। তিনি ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য।

ইউপি সদস্য চান মিয়ার চার ছেলে। এর মধ্যে বড় ছেলে সিঙ্গাপুর প্রবাসী, মেজো ছেলে আসলাম বেকার, সেজো ছেলে আছাদুজ্জামান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৯ সালের এপ্রিলে মারা গেছেন আর ছোট ছেলে আপেল অনার্সে পড়ছেন।

অতিদরিদ্রদের জন্য সাময়িক কর্মসংস্থান কর্মসূচি ইজিপিপি প্রকল্পের ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে শ্রমিকের তালিকায় ইউপি সদস্য চান মিয়ার মেজো ছেলে আসলাম ও সেজো ছেলে মৃত আছাদুজ্জামানের নাম রয়েছে। এ দুজনের নামে বছর শেষে টাকাও তোলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ইজিপিপি বাস্তবায়ন কমিটির জেলা পর্যায়ের সদস্য এবং জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, এ প্রকল্পে শুরু থেকেই যে দুর্নীতি হয়, এর জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে সচ্ছল চান মিয়া মেম্বারের ঘটানো এ কাণ্ড। প্রকল্পটি শুধু হতদরিদ্রদের উপকারের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হয়। কিন্তু বাস্তবে দরিদ্ররা এখান থেকে কোনো উপকার পাচ্ছেন না। কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি এ প্রকল্প থেকে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, ইজিপিপি প্রকল্পে কেউ মাটি না কাটলে তাকে টাকা দেয়া হয় না। আর শ্রমিককে সশরীরে উপস্থিত হয়ে টিপসই বা স্বাক্ষর দিয়ে ব্যাংক থেকে চেক তুলতে হয়। তাহলে ধরা যায়, চান মিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পরও প্রকল্পের মাটি কেটেছেন এবং ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন। তিনি এ বিষয়ে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানান।

স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বলেন, শুধু মৃত ব্যক্তির নামেই নয়, ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভুয়া অনেকের নাম শ্রমিকের তালিকায় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই। এভাবে প্রতিবছর অর্ধকোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়।

এ বিষয়ে ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য চান মিয়া বলেন, দেড় বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমার ছেলে আছাদুজ্জামান মারা গেছে। ইজিপিপি প্রকল্পের ২০২০-২১ অর্থবছরের শ্রমিকদের তালিকায় আছাদের নাম আমি দেইনি। আছাদের ভোটার কার্ড দিয়ে আমার ছোট ছেলে আপেল নাম দিয়েছে। বিষয়টি জানা ছিল না। ছোট ছেলে অনার্সে পড়ে। ভাইয়ের ভোটার কার্ড দিয়ে নিজেই মাটি কাটবে ভাবছে। কাজটি আমাদের ভুল হয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরেও শ্রমিক তালিকায় আছাদুজ্জামানের নাম থাকা এবং ব্যাংক থেকে তার টাকা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর তার নামে ব্যাংক থেকে কোনো টাকা আমি তুলিনি। কেউ হয়তো তুলতে পারেন। বিষয়টি আমার জানা নেই।

সচ্ছল হওয়ার পরও শ্রমিকদের তালিকায় দুই ছেলের নাম কেন- জবাবে চান মিয়া বলেন, আমার সেজো ছেলে আছাদুজ্জামান তো মারাই গেছে। মেজো ছেলে আসলামের নাম দিয়েছি। কারণ সে এখন বেকার। বেকু দিয়ে প্রকল্পের মাটি কেটে আসলাম আমার কাজে সাহায্য করে। তাই আসলামের নাম দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, আমার টাকা-পয়সা থাকতে পারে। কিন্তু আমার ছেলেদের কিছু নেই। তাই তাদের নাম দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের হাজরাবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইজিপিপি প্রকল্পের প্রথম কিস্তির সাত হাজার টাকা ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে চেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের মাঝে দেয়া হয়। ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আছাদুজ্জামানের নামে বরাদ্দ করা সাত হাজার টাকার চেকটিও দেয়া হয়েছে।

মৃত ব্যক্তি কীভাবে চেক দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন- জবাবে ব্যাংক ম্যানেজার বলেন, ছয় মাস আগে আমি এ শাখায় যোগ দিয়েছি। মৃত ব্যক্তির নামে কীভাবে চেক ইস্যু করা হয় বা মৃত ব্যক্তি কীভাবে চেক নেন, তা আমার জানা নেই। আমার আগের কর্মকর্তা বলতে পারবেন।

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামিম আল ইয়ামিন বলেন, মৃত ব্যক্তির ব্যাংক থেকে টাকা তোলার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, শ্রমিক তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম থাকার সুযোগ নেই। যদি থেকে থাকে, তদন্ত করে সেই নাম বাদ দেয়া হবে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী বলেন, ইজিপিপিতে মৃত ব্যক্তির নাম থাকা ও টাকা তোলার বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের ইজিপিপির কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের নভেম্বরে এবং ২০২০ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে শ্রমিকদের বিল দেয়া হয়।

মানচিত্র২৪/রা.হা

Related posts

ঝিনাইদহে বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালিত

Rabbi Hasan

মনিরামপুরে ভূমি-গৃহহীন ২৬২ পরিবার পেল নতুন বাড়ি

Maydul Islam

কুকুরের কামড়ে আহত ২৫

Sakib

Leave a Comment

Translate »